পঞ্চান্নতম অধ্যায় — যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়, তবে যেন আমাকে ভোলা না হয়
আপাও আমার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘‘তোরে বলছিলাম না মদ খাস না, তবু শোনলি না, এখন এই কষ্টটা হচ্ছে, দেখ।’’
আমি বমি শেষ করে, টিস্যু দিয়ে মুখটা মুছে নিলাম, তারপর বললাম, ‘‘আমি তো খুশি, নতুন চাকরি ছাড়লাম, সঙ্গে-সঙ্গে বড়লোকের কাছে টান পড়ল, তাতে আনন্দ হবে না?’’
আপাও একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, ‘‘কী রে, তুই কি আমার গা-টা ধরে বিয়ে করতে চাস নাকি?’’
আমি ওকে ঘুষি মারলাম, বললাম, ‘‘এত ঘনিষ্ঠতার পরেও কি আমাদের মধ্যে বিয়ে-টিয়ে লাগে? তুই তো অনেক আগেই আমার হয়ে গেছিস।’’
সে হেসে উঠে বলল, ‘‘যা যা, ভাই আমি তোর মতো কাউকে চাই না, গায়ে তো কত রকমের সমস্যা!’’
আমি বললাম, ‘‘আপাও, ভাগ্য ভালো হলে ভুলিস না, কেমন?’’
এই নিরেট অশিক্ষিত! এই কথাটার মানে পর্যন্ত বোঝে না, সোজা আমার কাঁধে একটা থাবা মেরে বলল, ‘‘তুই-ই তো কুকুর, ভালোভাবে কথা বল।’’
বাপরে! আমি একেবারে অবাক, ওর কান মুচড়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘‘এই কুকুর মানে তোকে গালি দিইনি ভাই, এই কথার মানে হচ্ছে—তুই যদি বড়লোক হোস, তবে আমাকে ভুলে যাস না।’’
ও একটু অপ্রস্তুত হয়ে লাজুকভাবে মাথার পেছনটা চুলকে বলল, ‘‘এই, বাংলা তো ভালো শেখা হয়নি। তোকে ভুলে যাব কী করে, আমি তো অপেক্ষা করছি, তুই আমার কেটিভিতে ‘মাম্মি’ হবি।’’
আমি পা দিয়ে সোজা লাথি মারলাম, ও বুঝে গিয়েছিল, আগেভাগেই লাফিয়ে দূরে সরে গেল।
আমরা দু’জন মুখ চেয়ে হাসলাম। সেই মুহূর্তে, আমার মনে হালকা বিষণ্নতা এলো। হঠাৎ টের পেলাম, এত বছর পরেও, একমাত্র আপাও-ই আমাকে ছাড়েনি। ছোট ভাই, মোটা, কেউ-ই আর যোগাযোগ করে না, হুয়াং ইং-ও শুধু শুরুতে একটু উষ্ণতা দেখিয়েছিল, চেন শি সম্পূর্ণ একটা বাজে ছেলে—আর কিছু বলার নেই। অপ্সরী ছাড়া আমার জীবনে যার জন্য সবচেয়ে বেশি ভাবি, সে-ই এই আপাও, যে প্রতিবছর এক চক্র করে আরও মোটা হচ্ছে।
আমি হঠাৎ অনেক গম্ভীর হয়ে গেলাম, বললাম, ‘‘আপাও, তুই বাড়ি যা, আমি উপরে যাচ্ছি, সাবধানে গাড়ি চালাবি।’’
ও বলল, ‘‘ঠিক আছে, তুই উপরে গিয়ে ভালো করে বিশ্রাম নে, খালি পেটে ঘুমাবি না, কিছু খেয়ে নিস।’’
আমরা সেখানেই বিদায় নিলাম। বাড়ি ফিরে, বিছানায় গড়াগড়ি করেও ঘুম এল না, উঠে পড়লাম। ভাবলাম, কাল থেকে আর অফিসে যেতে হবে না—মনটা একদিকে হালকা, অন্যদিকে ভারী, কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না। তখনই স্থানীয় ফোরাম খুলে দেখলাম, হুয়াং ইং সেখানে আউটডোর অ্যাডভেঞ্চারের খবর দিয়েছে।
তারা কাছের এক বড় পাহাড়ে হাঁটা-হাঁটি করতে যাবে, যা এখনো কেউ আবিষ্কার করেনি। শুধু দড়ি, তাঁবু ইত্যাদি দরকারি জিনিসপত্র আর কিছু শুকনো খাবার নেবে। আমি হুয়াং ইং-কে ফোন দিলাম, ও বলল, সে ঘুমাচ্ছে। আমি বললাম, ‘‘তাতে কী! কাল আমাকে নিতেই হবে।’’ ও বলল, ‘‘তোর যন্ত্রপাতি কি সব রেডি আছে?’’ আমি বললাম, ‘‘এতো কম সময়ের মধ্যে কীভাবে জোগাড় করব?’’ সে বলল, ‘‘তাহলে পরেরবার।’’, আমি বললাম, ‘‘না, আমি কালই যাবো।’’
তখন রাত এগারোটা বাজে, বাইরে গিয়ে কিছু কিনে আনা সম্ভব নয়। আমি আউটডোর গ্রুপে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘কে একটু সরঞ্জাম ধার দেবে?’’ কেউই উত্তর দিল না।
তাই কিউ-র সিগনেচারে লিখলাম, ‘‘কাল আউটডোর যেতে যাচ্ছি, কোনো সরঞ্জাম নেই, ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিলাম।’’
তারপর কম্পিউটার বন্ধ করে ছয়টার অ্যালার্ম দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ভাবলাম, বড়জোর কাল হুয়াং ইং-এর সঙ্গে তাঁবু ভাগাভাগি করব, যা কিছু সরঞ্জাম পাওয়া যায়, তাই দিয়েই চলবে।
পরদিন সকাল ছ’টায় ঘুম থেকে উঠে মুখ-হাত ধুয়ে, হুয়াং ইং-এর সঙ্গে কথা বলে নিচে নেমে এলাম।
বাড়ির গেট পেরোতেই দেখি, সেখানেই হঠাৎ সুচেং-এর গাড়ি দাঁড়িয়ে।
সে আমাকে দেখে গাড়ির কাঁচ নামাল। আমি অবাক, ভাবলাম, এখানে সে কী করছে?
আমি এগিয়ে গিয়ে ডাকলাম, ‘‘সুচেং স্যার।’’
সে হালকা হাসল, গাড়ি থেকে নেমে সোজা ট্রাঙ্ক খুলল, বলল, ‘‘আগে কিনে রাখা আউটডোরের সরঞ্জাম, এগুলো তুমি নিয়ে যাও।’’
...আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম, বললাম, ‘‘আপনি জানলেন কী করে?’’