চতুর্দশ অধ্যায় স্বচ্ছজল ভোজনালয়ে আত্মিক রন্ধনশিল্পীর শিক্ষানবিশ
নিজের চোখের সামনে আবারও মা-বাবার বিদায় দেখা, তবু কিছুই করতে না পারা—ফু শাওইউনের অন্তরে গভীর হতাশার ছায়া নেমে এলো। তবে চলে যাওয়া মানুষরা তো মাটির নিচে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে, বেঁচে থাকা মানুষদের তো এখনও বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হবে। কেবল অতীতের দুঃখে ডুবে থাকলে কিছুই সমাধান হয় না।
জীবন—এ এক রহস্যময় ও বক্রপথের যাত্রা, কখনওই সরল পথ নয়।
ফু শাওইউন মনকে শক্ত করল, নিজেকে আবারও সংগঠিত করল, উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। পূর্বের সব অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কে আঁকা হয়ে আছে, সেগুলো সোনালী স্মৃতি, অমূল্য শিক্ষা। ‘‘এবার আবার শুরু হলে, আগের চেয়ে তো নিশ্চয়ই খারাপ হবে না?’’
---
স্বচ্ছজল পানশালা—নদীর ধারে নির্মিত, নির্মাণশৈলীতে স্নিগ্ধতা ও রুচিশীলতা মিশে আছে, সাহিত্যিক আর কবিদের মনে অগাধ ভালোবাসা জাগায়; কবিতা রচনা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে আড্ডা, সত্যিই চমৎকার এক পরিবেশ।
শুধু তাই নয়, পানশালার খাবারও অতুলনীয়। গোপন সূত্রে শোনা যায়, স্বচ্ছজল পানশালার মালিকের আছে দারুণ প্রভাব—এখানে কখনও বেতন কাটা হয় না, বরং অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যায়: ঔষধি ট্যাবলেট, জাদুকরী পাথর, জাদুবৃক্ষাদি; কিছু নিয়ম মেনে এগুলো সংগ্রহ করা যায়।
এমন চমৎকার কর্মস্থল আর দ্বিতীয়টি শহরে নেই, তাই অধিকাংশ জাদুঅন্নপ্রস্তুতকারক প্রাণপণ চেষ্টা করেন এখানে কাজ পেতে। বলা যায়, স্বচ্ছজল পানশালায় সবচেয়ে কমতি নেই যাদের, তারা হলেন জাদুঅন্নপ্রস্তুতকারক। একতলায়ই আছে ডজনখানেক, সকলেই সেরা মানের, কাজেই খাবার খারাপ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
এখানে একটু ব্যাখ্যা—জাদুঅন্নপ্রস্তুতকারক, এক ধরনের পেশাজীবী, যাঁরা বিশেষ পদ্ধতিতে জাদুসম্পৃক্ত খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করেন, যাতে খাবারের জাদু শক্তি যথাসম্ভব রক্ষা পায়।
জাদুঅন্নপ্রস্তুতকারকদের ১ থেকে ৯ পর্যন্ত স্তর আছে, আবার তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত—১-৩ প্রাথমিক, ৪-৬ মধ্য, ৭-৯ উচ্চ। নবম স্তর মানেই শিখরের কাছাকাছি দক্ষতা। তার পরে আদৌ কোনো শ্রেণিবিভাগ আছে কি না, কেউ জানে না।
আসলে, জাদুঅন্নপ্রস্তুতকারক তো শেষ পর্যন্ত রান্নার কারিগরই। কেউ যদি নবম স্তর পর্যন্ত রান্না গবেষণা করতে পারে, সে তো যথেষ্ট প্রতিভাবান। এত মেধা থাকলে ঔষধ প্রস্তুতকারী হওয়াই ভালো, রান্নায় সময় নষ্ট করার মানে নেই। ঔষধ প্রস্তুতকারকেরা এই মহাদেশে সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন।
---
ফু শাওইউন পরনে নিল সুবিধাজনক পোশাক, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে স্বচ্ছজল পানশালার দিকে এগিয়ে চলল। তার চলনে ছিল অবজ্ঞা, দৃপ্ততা; পেছন থেকে দেখলে মনে হতো, সে যেন বিজয়ীর মতো এগোচ্ছে। পথচারীরা অবচেতনেই দু’বার তাকিয়ে নিল।
প্রত্যাশিতভাবেই, পানশালার দরজার দু’জন পাহারাদার তাকে পথ রোধ করল, ‘‘এই ভদ্রলোক, একটু দাঁড়ান তো, আপনার কাছে পরিচয়পত্র আছে?’’
পাহারাদার ফু শাওইউনকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে একরাশ সন্দেহ নিয়ে বলল—কোনোমতেই মনে হচ্ছে না সে খেতে এসেছে, বরং গোলমাল করতে এসেছে।
পরিচয়পত্র—একটি বিশেষ প্রতীক, স্বচ্ছজল পানশালার নির্দিষ্ট জিনিস।
ফু শাওইউন সামান্য লজ্জার হাসি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বলল, ‘‘পরিচয়পত্র? ও তো আমার নেই।’’
দু’জন পাহারাদারের মুখ কড়া হয়ে গেল, হাতে ধরা লাঠি শক্ত করে ধরল, যেন একটু পরেই কিছু একটা ঘটবে।
ফু শাওইউনের বিন্দুমাত্র ভয় নেই, সে ডানদিকের পাহারাদারের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘‘উত্তেজিত হবেন না, আমি কিন্তু জাদুঅন্নপ্রস্তুতকারক শিক্ষানবিশ হতে এসেছি।’’
বাঁদিকের পাহারাদার হেসে উঠল, ‘‘তুমি? আর জাদুঅন্নপ্রস্তুতকারক শিক্ষানবিশ?’’
ডানদিকের পাহারাদারও পাত্তা দিল না, দু’জনের হাতের লাঠিও আলগা হয়ে এলো। ‘‘এতটুকু মেয়ে, দুধের গন্ধ যায়নি, এসেছো শিক্ষানবিশ হতে! যাও, গিয়ে ঠান্ডা জায়গায় বসে থাকো, এখানে গোলমাল কোরো না।’’
ফু শাওইউন আবারও লাজুক হাসি দিয়ে আদুরে গলায় বলল, ‘‘ওটা কেন বলছো, দাদা! আমি তো অনেক দূর পথ হেঁটে এখানে এসেছি!’’
এরপর সে বুকের ভেতর থেকে একটা জিনিস বের করল, চারপাশে তাকিয়ে বলল, ‘‘তোমরা দু’জন আমার সঙ্গে এসো, চুপিচুপি তোমাদের দেব, এটা আমাদের বংশের ধন, খুবই মূল্যবান!’’
দু’জন পাহারাদার একে অপরের দিকে তাকাল, ‘‘দেখি?’’ ‘‘চলো, দু’জন একসঙ্গে গেলে কিসের ভয়?’’
তিন জন একসঙ্গে কোণের দিকে এগোল। পাহারাদাররা এখনও ভালো করে দাঁড়াতেই পারেনি, ফু শাওইউন হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল, বাঘের মতো দ্রুত তাদের পিছনে ঘুরে গিয়ে হাতে থাকা জিনিসটা দিয়ে দু’জনের মাথায় বাড়ি দিল।
‘‘ডুয়াং, ডুয়াং’’—দু’টো আওয়াজ, যেন প্রতিধ্বনি শোনা গেল, বোঝাই যায় কতটা জোরে মারা হয়েছে। পাহারাদারদের কিছুটা জাদু শক্তি ছিল, তাই এক আঘাতে অচেতন হলো না, উঠে দাঁড়াতে চাইলো।
ফু শাওইউন ধীরে-সুস্থে তাদের লাঠি কুড়িয়ে নিয়ে আরও কয়েকবার মারল, ‘‘এইবার তোমাদের মাথা ম্যাসাজ করে দিই, দুধের গন্ধ যায়নি বলে যে বলেছিলে!’’
‘‘দুধ ছাড়ছো কি না, বলো তো!’’
একটা খটাস শব্দে লাঠিটা ভেঙে গেল, পাহারাদাররাও অজ্ঞান।
ফু শাওইউন ডান হাতে ধরা জিনিসটা এলোমেলোভাবে মাটিতে ফেলে দিল। এবার খেয়াল করল, সেটি কোনো বংশগত ধন নয়, স্রেফ সাধারণ এক টুকরো পাথর।
---