পঞ্চম অধ্যায়: ধনভাণ্ডার, আত্মার প্রবাহ? - এক

প্রভু একজন মহানুভব মানুষ। সাধারণ মানুষের গল্প 3421শব্দ 2026-02-10 00:35:58

এদিকে, যাদের মধ্যে ইয়েফেই নির্বাচিত হননি, তারা সবাই সিলিমুর কাছ থেকে সোনার মুদ্রা নিয়ে, কষে একবার তাকিয়ে নীরবে সভাকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। হঠাৎ, এক প্রবল শক্তির স্রোত তাদের দিকে ধেয়ে এসে এমনভাবে চেপে ধরল যে, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে সিলিমুর গম্ভীর কণ্ঠ তাদের কানে বাজল, ‘‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি প্রভুর ক্ষতি করার চেষ্টা করে, আমি তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলব।’’

এইদিকে ইতিমধ্যে আনুগত্য স্বীকার করা ছয়জন হতবাক হয়ে সিলিমুর দিকে তাকিয়ে ছিল, তার শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রতাপ তাদের ভেতর ভয় ও চাপ সৃষ্টি করল, ফলে তাদের সারা গায়ে ঘাম দিয়ে উঠল। যেই কয়েকজন হতাশ হয়ে কক্ষ ছেড়ে গেল, ইয়েফেই তার নির্বাচিত ছয়জনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘তোমরা নিশ্চিন্ত থেকো, যদি ভবিষ্যতে আমার প্রতি অবিচলিত বিশ্বস্ততা রাখো, আমি তোমাদের কোনো ক্ষতি করব না। বরং শীঘ্রই তোমাদের অগাধ ধনসম্পদ ও অপরিসীম শক্তি দান করতে পারব, এমনকি তোমরা তরবারির দেবতা হওয়ার স্বপ্নও পূরণ করতে পারো।’’

পরে, তিনি পাশে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছয়জনকে উপেক্ষা করে সিলিমুর দিকে ফিরে বললেন, ‘‘সিলিমু দাদু, আমার এই প্রভুর অধীনে জমিদারির পরিমাণ কতটা বড়? কোনো মানচিত্র আছে কি দেখার মতো? আমি জানতে চাই আমার জমিদারি আসলে কোথায়।’’

সিলিমু তখনি তৎপর হয়ে নিজের স্পেস রিং থেকে একটি পুরনো, কিছুটা হলদেটে, ছেঁড়া-ফাটা, খুবই সাধারণ মানচিত্র বের করল, যা বোঝা যায় কোনো অজানা ম্যাজিক জন্তুর চামড়া দিয়ে তৈরি। এরপর সে মানচিত্রের একটি লাল বিন্দুর দিকে আঙুল তুলে ইয়েফেইকে বলল, ‘‘প্রভু, এটাই আপনার জমিদারি, ‘ম্যাপল পাতার নগর’। এটি অগ্নি ড্রাগন সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তে, মহাদেশের দক্ষিণের অন্তহীন অরণ্য এবং পশ্চিমের পশুচারকদের সাম্রাজ্যের সংযোগস্থলে অবস্থিত। উত্তরে ভাড়াটে সৈনিকদের সাম্রাজ্যের সীমান্ত শহর কারাচি, এখান থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরে।’’

ইয়েফেই মনোযোগ দিয়ে শুনছে দেখে সিলিমু আবার বলল, ‘‘জমিদারির আয়তন ঠিক কতটা বলা মুশকিল, বহু বছর ধরে ইয়ের পরিবার থেকে কেউ এখানে আসেনি। আর এই মানচিত্রটিও দুর্গ পরিষ্কার করার সময় খুঁজে পাওয়া, কতটা নির্ভরযোগ্য তা বলা মুশকিল। তবে দুর্গের পাশের ছোট শহরটাই ম্যাপল পাতার নগর, আপনি চাইলে কাল সেখানে গিয়ে খবর নিতে পারেন।’’

সব শুনে ইয়েফেইর খুব হতাশ লাগল। জমিদার হয়ে সে নিজের জমিদারির আয়তন, জনসংখ্যা, জীবনযাত্রার মান কিছুই জানে না! তাই সে ঠিক করল, কাল ম্যাপল পাতার নগরে গিয়ে সব জেনে পরিকল্পনা করবে।

ঠিক তখনই সিলিমু বলল, ‘‘প্রভু, আমাদের খাদ্য ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। বড়জোর তিনদিন চলবে। খাদ্য কিনতে হলে সবচেয়ে কাছের শহর হল কারাচি। আপনি চাইলে কাল আমি কয়েকজন লোক নিয়ে খাদ্য ও মাংস কিনে আনতে পারি।’’

ইয়েফেই বলল, ‘‘এই বিষয়টা তুমি সামলাও। তবে কাল আমি ম্যাপল পাতার নগর দেখতে চাই। আর এখন আমি দুর্গের বাইরে একটু ঘুরে দেখতে চাই।’’

এরপর ইয়েফেই সভাকক্ষ ছেড়ে দুর্গের বাইরে চলে গেল। জেসলি সঙ্গে সঙ্গে তার পিছু নিল, অন্য ছয়জনও যেতে চাইলে সিলিমু তাদের থামিয়ে দিল।

এই সময় ইয়েফেই মনে মনে ভাবছিল, এটাই প্রথমবার সে এই দুর্গ ছেড়ে বাইরে এল, প্রথমবার দেখবে ভিন্ন জগতের প্রকৃতি। কে জানে, কী চমক অপেক্ষা করছে?

খুব দ্রুতই ইয়েফেই দুর্গের বাইরে এসে দাঁড়াল। সে দুর্গের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করল। ডানদিকে কয়েকশো মিটার দীর্ঘ নদী, তার ওপরে প্রায় হাজার মিটার লম্বা, কয়েক মিটার চওড়া পাথরের সেতু, যা নদীর ওপারের ভাঙাচোরা শহরের সঙ্গে যুক্ত। বামদিকে দিগন্তবিস্তৃত অনুর্বর জমি ও উঁচুনিচু পাথুরে পাহাড়, সামনে ভাঙাচোরা প্রশস্ত পাথরের পথ, যার গা ঘেঁষে নতুন খোঁড়া কয়েক মিটার চওড়া রাস্তা।

পেছনে ফিরে ইয়েফেই দেখল, যেখানে সে এখন থাকে, সেটা কয়েকশো বর্গমিটার জায়গার মধ্যে একটা ভগ্নপ্রায় দুর্গ, দেখে মনে হয় খুব শিগগিরই ভেঙে পড়বে। দুর্গের পেছনের অবস্থা কেমন সে জানে না, তবে অনুমান করেই নিতে পারে খুব ভালো কিছু হবে না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, হতাশচিত্তে মাথা নেড়ে আবার দুর্গে ফিরে গেল।

হাঁটতে হাঁটতে ইয়েফেই মনে মনে আক্ষেপ করল, আহা, তার কপালটা কেমন খারাপ! অন্যরা যখন এভাবে সময়-ভ্রমণ করে, তখন কেউ অপ্রতিরোধ্য শক্তিশালী, কেউ রাজকীয় ব্যক্তিত্বে সবাইকে মুগ্ধ করে, সবচেয়ে বাজে হলেও অলস কোনো সম্পন্ন বখাটে। অথচ সে নিজেও একরকম অপদার্থ হলেও মনে হচ্ছে ভাগ্যটা একটু বেশিই খারাপ। তবে যেহেতু এসেছে, মানিয়ে নিতে হবে! নিজের হাতে কিছু করলে নিশ্চয়ই ভাগ্য ফিরবে!

এসময় হঠাৎ ইয়েফেইর মনে এক ভাবনা এল—‘শহর গড়ব’, মহাদেশে নজিরবিহীন এক নগর গড়ে তুলবে সে। কিন্তু টাকা কোথায় পাবে?

এটাই সমস্যা, রাজধানী থেকে আনা টাকা প্রায় শেষ, পরিবারও তখন মাত্র তিন হাজার সোনার মুদ্রা দিয়েছিল। আহা, টাকা, টাকা, টাকা! হঠাৎ তার স্মৃতির গভীরে ভেসে উঠল এক তথ্য—পরিবারের উনিশতম প্রজন্মের এক প্রতিভাবান আলকেমিস্টের গুপ্তধন পরিবারের আদি দুর্গের নিচে লুকানো আছে।

এই আকস্মিক স্মৃতি ঐ দুর্ভাগা ছেলেটি, যার দেহ সে দখল করেছে, পরিবারিক গ্রন্থাগারে পড়া এক雑记তে পড়েছিল। এই তথ্য আবিষ্কারের পর সে বইটা পুড়িয়ে ফেলেছিল, এবার এখানে এসে সে সেই গুপ্তধন খুঁজতে চায়।

মনে মনে এই স্মৃতি ঝালাই করে নিয়ে ইয়েফেই হেসে উঠল, ‘‘হা হা হা...’’ হাসির শেষেও ভাবল, ঈশ্বর কারও পথ পুরোপুরি আটকায় না, গুপ্তধন আমি আসছি! আবারও কয়েকবার হাসল সে, তারপর সোজা দুর্গের ভেতরে ছুটল।

এসব দেখে ইয়েফেইর পেছনে আসা জেসলি অবাক হয়ে ভাবল, প্রভুর এমন আনন্দের কারণ কী?

দুর্গে ফিরে ইয়েফেই সঙ্গে সঙ্গে সিলিমুকে ডেকে নিয়ে নিজের থাকার ঘরে গেল, বলল, বাইরে পাহারা দিও, আমার অনুমতি ছাড়া কেউ ঢুকবে না। এরপর সে পাথরের ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে মনে মনে ভাবল, ‘‘সিস্টেমে প্রবেশ করতে চাই।’’

হঠাৎ, ইয়েফেইর দেহ এক ঝলকে অদৃশ্য হয়ে সিস্টেম স্পেসের কক্ষে পৌঁছাল। সেখানে গিয়ে প্রথমে নিজের গুণপুণ্যের স্কোর দেখল—১৩ পয়েন্ট আছে।

তারপর সে হাসিমুখে বলল, ‘‘এ বাড়িতে কেউ আছ? ৯৫২৭ নম্বর কর্মী আছ কি? আমি বিনিময় করতে চাই।’’

এই সময় এক বৈদ্যুতিক কণ্ঠ ভেসে এল, ‘‘আবারও সুপার গুণপুণ্য বিনিময় সিস্টেমে স্বাগতম, আমি এই সিস্টেমের তত্ত্বাবধায়ক, নম্বর ৯৫২৭। আপনি কী বিনিময় করতে চান?’’

শুনে ইয়েফেই বলল, ‘‘আমি দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র বিনিময় করতে চাই।’’

হঠাৎ, তার সামনে বিশাল এক তালিকা ভেসে উঠল, দেখে চোখ ঝলসে গেল। সে চোখ বন্ধ করে মনে মনে ভাবল, প্রতিবারই এত বড় তালিকা কেন দেখায়, খুব ঝামেলা!

ঠিক তখনই, যেন ৯৫২৭ তার মনের কথা বুঝতে পারল। কণ্ঠটি বলল, ‘‘আপনি শুধু নাম বললেই হবে, এতে ঝামেলা নেই।’’

ইয়েফেই ভাবল, ঠিকই তো, আমি সত্যিই বোকা! তারপর বলল, ‘‘কয়েকটি সৌরশক্তি চালিত টর্চ, বিশটি ট্যাবলেটসহ একটি অ্যান্টিডোটের বোতল, এক বাক্স টুথব্রাশ, এক বাক্স টুথপেস্ট, ত্রিশটি তোয়ালে, দশটি স্টেইনলেস কাপ, এক ডজন লাইটার, নানা স্বাদের ইনস্ট্যান্ট নুডলস, বোতলজাত পানি, শুকনো মাংস, মদ, নাস্তা—প্রতিটি জিনিসের দশটি বাক্স এবং আরও কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী।’’

একটু থেমে আবার বলল, সঙ্গে সঙ্গে সে তায়চি অভ্যন্তরীণ শক্তি সাধনার পদ্ধতি, কুংফু, তরবারির কৌশল এবং একটি চীনা ঢঙের তলোয়ার—‘মুক্ত ড্রাগনের তরবারি’ও বিনিময় করল। শেষে সিলিমু ও জেসলির জন্য একটি করে জাদুকরি অস্ত্রও নিল।

মোট বিশবার বিনিময় করল, সবমিলিয়ে দশটি গুণপুণ্য পয়েন্ট খরচ হল। সব বলার পরই দেখল, সব জিনিস তার সামনে হাজির। সে একে একে সব জিনিস স্পেস রিংয়ে রাখল।

তারপর স্ক্রিনে তিনটি গুণপুণ্য পয়েন্ট দেখে তার মনে কষ্ট, কিন্তু যখন দেখে অভিজ্ঞতার পয়েন্ট ২৯০, তখনি মনটা আবার ফুরফুরে লাগল। সে মনে মনে ভাবল, এবার বাইরে যাব।

বাইরের জগতে ফিরে ইয়েফেই সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে ডেকে বলল, একটু পরে তাদের জন্য চমক আছে, তারপর সভাকক্ষে চলে গেল।

সবাই এলে ইয়েফেই ইয়েতিয়ানকে বলল, ‘‘ইয়েতিয়ান, তুমি গিয়ে ওই চেয়ারটা সরাও।’’

ইয়েতিয়ান শুনে প্রভুর নির্দেশে, আবারও দেখে ইয়েফেই তার আঙুল সভাকক্ষের সামনে রাখা চেয়ারটার দিকে নির্দেশ করছে, যেটাতে আগে ইয়েফেই বসেছিল। সে কিছু না জিজ্ঞেস করেই চেয়ারটা ঘাড়ে তুলে সরিয়ে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায়।

কিন্তু সে আর কোনো নির্দেশ শুনল না, বরং দেখল, প্রভু নিজেই এগিয়ে এসে চেয়ার সরিয়ে রাখা জায়গায় হাতড়ে হাতড়ে খোঁজ করছে।

একটু পর ইয়েফেই সিলিমুকে বলল, ‘‘সিলিমু দাদু, তুমি কি এই পাথরখণ্ডটা খুলতে পারবে? এটা প্রায় অর্ধমিটার মোটা।’’

সিলিমু কিছু না বলে মাথা নাড়ল, কাছে এসে হালকা চাপ দিতেই পাথরটা চিঁড়ে পড়ে গেল, বেরিয়ে এল ছোট্ট এক গর্ত।

ইয়েফেই এগিয়ে গিয়ে গর্তে হাত ঢুকিয়ে একটা সুইচ টিপল।

হঠাৎ, পেছন থেকে গর্জন শুনে সে দেখল, সভাকক্ষের মাঝখানের মেঝেতে তিন মিটার চওড়া গর্ত তৈরি হয়েছে।

সবাই অবাক হয়ে সেই গর্তের দিকে তাকিয়ে ইয়েফেইর দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাল।

ইয়েফেই শুধু হেসে বলল, ‘‘এই তো তোমাদের জন্য চমক, আমি পরিবারের এক পূর্বপুরুষ প্রতিভাবান আলকেমিস্টের গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছি, এবার চল সবাই মিলে গুপ্তধন খুঁজতে।’’

এমন সময় ইয়েফেই অনুভব করল, ইয়েহুয়াং এই কথা শুনে প্রবল উত্তেজিত, চেহারায় বিস্ময়ের ছাপ, যদিও দ্রুত তা আড়াল করল। ইয়েফেই মনে মনে ভাবল, এ লোকটা বেশ ভালোভাবে নিজেকে আড়াল করতে জানে, ভাগ্যিস আমি সদা তার ভাবাবেগ ও আত্মিক শক্তির ওপর নজর রেখেছি।

দেখা যায়, এই জগতে ও প্রতিজ্ঞা মানে সবাই রাখে না; ভবিষ্যতে সব কিছুর জন্য দ্বিগুণ সাবধান থাকতে হবে।

পাঠকবৃন্দ, আপনাদের স্বাগতম, সর্বশেষ, দ্রুততম ও জনপ্রিয় ধারাবাহিক উপন্যাস পড়তে থাকুন! মোবাইল ব্যবহারকারীরা আমাদের মুঠোফোন প্ল্যাটফর্মে পড়ুন।